জানুয়ারি ১৮, ২০২৬
বনু সাকিফ গোত্রের সন্তান মুগিরা ইবনে শুবা। তার উপনাম আবু ঈসা, আবু আবদুল্লাহ বা আবু মুহাম্মদ। তার মা উমামা বিনতে আফকাম বনু নাসর ইবনে মুআবিয়া গোত্রের মেয়ে। পঞ্চম হিজরিতে খন্দক যুদ্ধের বছর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। সে বছরই মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। মুগিরা (রা.) নবীজি (সা.)-এর বিশেষ স্নেহধন্য সাহাবি ছিলেন। জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্ন ধীমান সাহাবিদের মধ্যে তাকে গণ্য করা হয়। তিনি বাইআতে রিজওয়ানে অংশগ্রহণ করেন। শারীরিক অবয়বে তিনি দীর্ঘদেহী ছিলেন। অত্যন্ত নির্ভীক, চিন্তক ও শ্রদ্ধামাখা ভীতির অধিকারী ছিলেন।
অনন্যতা যেখানে
ইয়ারমুক বা কাদসিয়ার যুদ্ধের দিন তার একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘নবীজি (সা.)-কে কবরে দাফন করার পর তার কবর থেকে সবার শেষে বেরিয়ে আসা লোকটি ছিলাম আমি। কারণ, সবাই যখন কবর থেকে বেরিয়ে এলো, তখন ইচ্ছে করেই কবরে আমার হাতের আংটি ফেলে আসি।’ এরপর আলী (রা.)-কে বলি, ‘আবুল হাসান! কবরে আমার আংটি পড়ে গেছে?’ তিনি বলেন, ‘কবরে নেমে নিয়ে আসুন।’ আমি তখন নিচে নেমে শেষবারের মতো নবীজি (সা.)-এর কাফন ছুঁয়ে বাইরে বেরিয়ে আসি।’
প্রখর বুদ্ধির নমুনা
কৌশল অবলম্বন, উপায় উদ্ভাবন, সতর্কতা এবং চাতুর্যা সংক্রান্ত তার বেশ কয়েকটি ঘটনা খুবই প্রসিদ্ধ। একবার ওমর (রা.) মুগিরা (রা.)-কে বাহরাইনের কর্মকর্তা নিযুক্ত করেন। কিন্তু বাহরাইনবাসী তাকে অপছন্দ করল। ওমর (রা.) তাকে সরিয়ে নেন। এরপরও বাহরাইনবাসী এ আশঙ্কা করতে থাকল, ওমর (রা.) আবারও তাকে তাদের কাছে পাঠাতে পারেন। তখন তাদের এক নেতা লোকজনকে বলল, ‘তোমরা যদি একটা কাজ করতে পারো, তাহলে আমি ওমর কর্তৃক এখানে তার পুনঃনিয়োগ আটকে দিতে পারি।’ তারা বলল, ‘বলুন, আমাদের কী করতে হবে?’ ওই নেতা বলল, ‘তোমরা ১ লাখ মুদ্রা সংগ্রহ করে আমার হাতে দাও। আমি ওগুলো নিয়ে ওমরের কাছে গিয়ে বলব, মুগিরা অবৈধ পন্থায় এ অর্থ জোগাড় করে আমার কাছে রেখেছেন।’ তারা তখন ১ লাখ মুদ্রা জমা করে তার হাতে তুলে দিল। লোকটি অর্থগুলো নিয়ে ওমর (রা.)-এর কাছে উপস্থিত হয়ে পরিকল্পিত কথাগুলো উপস্থাপন করল।
কৌশলের জোরে আত্মরক্ষা
ওমর (রা.) তখন মুগিরা (রা.)-কে ডেকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। মুগিরা (রা.) বলেন, ‘এখানে তো ১ লাখ নয়, ২ লাখ মুদ্রা থাকার কথা!’ ওমর (রা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিন্তু কোন জিনিস তোমাকে এমনটা করতে প্ররোচিত করল?’ মুগিরা (রা.) স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন, ‘পরিবার এবং প্রয়োজন।’ এবার ওমর (রা.) বাহরাইনি নেতাকে বললেন, ‘মুগিরার কথা তো শুনলে। এবার বলো, এ ব্যাপারে তোমার বক্তব্য কী?’ লোকটি ভয়াবহ বিপদ আঁচ করতে পেরে বলল, ‘আল্লাহর কসম, আমি আপনার কাছে সত্য বলছি, আসলে তিনি আমার কাছে কিছুই রাখেননি।’ ওমর (রা.) বিষয়টি বুঝতে পেরে মুগিরাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি এভাবে বললে কেন?’ মুগিরা (রা.) বললেন, ‘আমিরুল মুমিনিন, এ লোক আমার ব্যাপারে মিথ্যা বলছিল, তাই আমি তাকে লাঞ্ছিত করতে চেয়েছিলাম।’
গ্রহণযোগ্যতার স্বীকৃতি
শাবি (রহ.) সূত্রে বর্ণিত; কাবিসা ইবনে জাবিরকে বলেন, ‘আমি এ জন্য মুগিরা (রা.)-এর সান্নিধ্য গ্রহণ করেছি, যদি কোনো শহরে আটটি দরজা থাকে এবং কৌশল অবলম্বন ছাড়া কোনো দরজা দিয়ে বের হওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে মুগিরা (রা.) আটটি দরজা দিয়েই বেরিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য রাখেন।’ শাবি (রহ.) বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে সতর্কতা ও বিচক্ষণতায় চার সাহাবি ছিলেন সবার শীর্ষে। মুগিরা ইবনে শুবা (রা.) তাদের অন্যতম।’ ৪১ হিজরিতে মুআবিয়া (রা.) তাকে কুফার গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেন। খারিজিদের দমনে তার ভূমিকা ছিল চির স্মরণীয়। দীর্ঘ সময় পাওয়ায় কুফার জামে মসজিদের ব্যাপক সংস্কারের কাজ করেন। মসজিদটিকে একসঙ্গে ৪০ হাজার মানুষ নামাজ পড়ার উপযোগী করে গড়ে তোলেন। তিনি ৪৯ হিজরির অধিককাল পর্যান্ত কুফার গভর্নর ছিলেন।
পৃথিবীর মায়াত্যাগ
মুগিরা ইবনে শুবা (রা.)-এর মৃত্যুসন নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন, ৫০ হিজরিতে কুফায় যে প্লেগ মহামারি দেখা দিয়েছিল, তাতে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কেউ কেউ ৪৯ হিজরির কথা বলেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। তার সূত্রে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। বহু সাহাবি ও তাবেয়ি তার সূত্রে হাদিস বর্ণনা করেছেন। (সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৩/২৬, আল ইসাবাহ : ৩/৪৫২)।