মাহফিলে প্যান্ডেলের বাইরে রাত ১০টা পর্যন্ত মাইক চালু থাকতে পারে : মুহিব্বুল হক গাছবাড়ী রাহ.

জানুয়ারি ১৮, ২০২৬

(সাক্ষাৎকারটি ২০১৯ সালে নেওয়া। হঠাৎ নজরে পড়ায় ভাবলাম ফেসবুকে দিই। হুজুর এখন আমাদের মধ্যে নেই যদিও, তবু সাক্ষাৎকারটি হুবহু রেখে দিয়েছি। ভাষা, বানান এবং মানও তখনকার মতো রয়েছে। কোনো পরিবর্তন করিনি। আল্লাহ তাআলা হুজুরকে জান্নাতের আলা মাকাম দান করুন। আমিন)
বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, উস্তাযুল আসাতিযা, কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ শিক্ষাবোর্ড আল হাইয়াতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশের অন্যতম সদস্য, আযাদ দ্বীনি এদারায়ে তালীম বাংলাদেশের সহসভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, দ্বীনি বিদ্যাপীঠ জামেয়া কাসিমুল উলুম দরগাহে হযরত শাহজালাল রাহ. সিলেটের মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহিব্বুল হক গাছবাড়ী হাফিযাহুল্লাহ।
সিলেটের প্রাচীনতম দ্বীনি শিক্ষাগার, খলিফায়ে মাদানী মাওলানা বদরুল আলম শায়খে রেঙ্গা রাহ.’র স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহ্যবাহী জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গার শতবছর পূর্তি ও দস্তারবন্দী মহাসম্মেলন উপলক্ষে স্মারকের জন্য সাক্ষাৎকার নিতে কথা হয় শায়খুল হাদিস মুহিব্বুল হক গাছবাড়ী দা.বা.’র সাথে।
২০ নভেম্বর ২০১৯ ঈসায়ি, জামেয়া দরগাহে হযরতের অফিসে হযরত গাছবাড়ী হুজুরের সাথে কওমি মাদরাসা, এদারা, হাইআতুল উলইয়া ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে দীর্ঘ আলাপচারিতার একপর্যায়ে তিনি জামেয়া রেঙ্গা, শায়খে রেঙ্গা রাহ., মাওলানা শিহাবুদ্দিন মুহাদ্দিস সাহেব হুজুর রাহ. সম্পর্কেও আবেগঘন স্মৃতিচারণ করেন। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন স্মারক সম্পাদনা পরিষদের সদস্য ইলিয়াস মশহুদ।
পাঠকদের জন্য হযরতের সাথে আলোচনার চুম্বকাংশ তুলে ধরা হলো :
ইলিয়াস মশহুদ: আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ
গাছবাড়ী হুজুর: ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহ
ইলিয়াস মশহুদ: হুজুর কেমন আছেন?
গাছবাড়ী হুজুর: আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর রহমতে ভালো আছি।
ইলিয়াস মশহুদ: সিলেটকে বলা হয় ‘আধ্যাত্মিক রাজধানী’ এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
গাছবাড়ী হুজুর: জি, পুণ্যভূমি সিলেট আধ্যাত্মিক রাজধানী। কারণ, ভ্রষ্টতার আঁধারঘেরা এই সিলেটে পুণ্যাত্মা হযরত শাহজালাল, হযরত শাহপরাণ রাহ. ও ৩৬০ আউলিয়ার পদধূলিতে ধন্য হবার কারণেই সিলেটকে বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী বলা হয়ে থাকে। এছাড়া অসংখ্য মনীষার জন্ম হয়েছে এই সিলেটে।
ইলিয়াস মশহুদ: আল হাইআতুল উলইয়ার অধীনে ১৪৪০ হিজরি দাওরা পরীক্ষার ফলাফলে আযাদ দ্বীনি এদারা সিলেট খুব ভালো রেজাল্ট করেছে, আপনি কী বলবেন?
গাছবাড়ী হুজুর: এটা অত্যন্ত খুশির সংবাদ। তবে এর আগে যে ভালো হয়নি, তেমন নয়। এটা ঠিক যে, গত দুই বছরের চেয়ে এবার বেশ ভালো রেজাল্ট হয়েছে।
ইলিয়াস মশহুদ: জামেয়া কাসিমুল উলূম দরগাহে হযরত শাহজালাল রাহ. সিলেটের মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস, হেফাজতে ইসলাম সিলেটের সভাপতি, আযাদ দ্বীনি এদারার সহ-সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত নাযিমে ইমতেহান, এছাড়া আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের সাথে নানানভাবে জড়িত, তো এসব গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো কীভাবে আঞ্জাম দেন?
গাছবাড়ী হুজুর: আল্লাহর খাস রহমতে এসব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আঞ্জাম দেয়া সম্ভব হচ্ছে। আসলে সব কাজে নিয়তের শুদ্ধতা থাকা চাই। নিয়ত সহীহ থাকলে কঠিন কঠিন কাজও সহজে সম্পন্ন করা যায়। এছাড়া সর্বক্ষেত্রে কিছু নিয়মেরও অনুসরণ করতে হয়। প্রাত্যহিক কাজের একটা রুটিন থাকলে খারিজী ব্যস্ততার কবলে পড়তে হয় না; বরং তখন দায়িমী কাজগুলো করতে সুবিধা হয়। সবকিছুর পরে খোদায়ী মদদ না থাকলে বিলকুল সম্ভব হত না।
ইলিয়াস মশহুদ: আপনার ছাত্র জামানায় মাদারিসে কওমিয়্যার যে স্বাতন্ত্র্যবোধ ছিলো, এই দীর্ঘ সময়ে আপনার দেখায় কী মনে হয়, আগের মতো এখনো আছে?
গাছবাড়ী হুজুর: সমাজটাও তো আগের মতো নয়। সবকিছু পরিবর্তনশীল। আমাদেরকে চিন্থা করতে হবে বর্তমান সময় নিয়ে। অতীতের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। হঁ্যা, অতীতের ভালো জিনিসগুলোর অনুসরণ এবং মন্দ কাজগুলো থেকে পরহেজ করে আপনাকে এগিয়ে যেতে হবে। বর্তমানকে শুদ্ধ করতে হবে। অশুদ্ধ পথ ও পন্থা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং রাখতে হবে। অতীত থেকে মুক্তা খেঁাজে বর্তমান নিয়ে ভাবতে হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি গুরুত্ব দিয়ে ভবিষ্যতের জন্য অনুসরণীয় কিছু রেখে যেতে হবে। আর এটাই আপনার সফলতা।
ইলিয়াস মশহুদ: প্রচলিত আছে, যারা কওমি মাদরাসায় পড়েন এবং পড়ান, তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য আল্লাহর রেজামন্দি, সেটা শতভাগ ঠিক, কিন্তু কওমি মাদরাসার সার্বিক হালতে একজন শিক্ষকের জীবনধারনের প্রয়োজনীয়তাও কিন্তু অস্বীকার করা যায় না, এই বিষয়ে শতকরা প্রায় ৯৫ শিক্ষক মুহতাজ, আপনার কী মনে হয়?
গাছবাড়ী হুজুর: বিষয়টা ভাবনার। সময়ের পলাবদলে সবকিছুতে পরিবর্তন হয়। ঠিক যেমনটা একটু আগে আপনি উল্লেখ করেছেন। আগেকার উলামায়ে কেরাম তাকওয়া ও পরহেজগারিতে অনন্য ছিলেন, তাঁরা খালিস লিওয়াজহিল্লাহ দ্বীনের খেদমত করেছেন, এজন্য আল্লাহও তাঁদের সাহায্য করেছেন।
একনিষ্ঠভাবে দ্বীনের তরে নিজেকে বিলিয়ে দিলে আপনার সব জরুরিয়ায়াত যেভাবেই হোক পূরণ হবে। তবে শর্ত হলো, এই বোধ-বিশ্বাস আপনার অন্তরে শতভাগ কার্যকরী হতে হবে।
আর ৯৫ভাগ শিক্ষক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মুহতাজ হবে কেন? তারা তো মুহতাজ হবে আল্লাহর। তাঁর কাছেই চাইবে। এখন প্রশ্ন করতে পারেন, উসিলা হিসেবে কিছু একটা তো করতে হয়। সেটা ঠিক। এজন্য প্রতিষ্ঠান কতৃর্পক্ষের দায়িত্ব হচ্ছে, উলামায়ে কেরামের শান-মান রক্ষা করা। শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় হাজত পূরণের মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
ইলিয়াস মশহুদ: সমাজের মোড়লরা এক সময় মনে করত, কওমি মাদরাসা মানেই গরিব-এতীমদের শিক্ষাগার। আলহামদুলিল্লাহ, এখন অবস্থার অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে, বিষয়টা আপনি কীভাবে দেখছেন?
গাছবাড়ী হুজুর: সব কথার জবাব দিতে নেই। এটা একটা কায়দা। তো আগে যারা ‘কওমি মাদরাসা গরিব-এতীমদের শিক্ষাগার’ বলে চিল্লাচিল্লি করেছে, আমরা তখন কোনো জবাব না দিয়ে নিরব প্রতিবাদ করেছি। এই কারণে তাদের ‘চিল্লাচিল্লি’ হালে পানি পায়নি। আমরা আমাদের কর্মতৎপরতার মাধ্যমে সেটার অলিখিত একটা জবাব দিয়ে আসছি। আরও দেব।
বর্তমানে এমনও অনেক আছেন, যারা একসময় কওমি মাদরাসা নিয়ে বিরূপ ধারণাপোষণ করতেন, এখন তাদেরই ছেলে-মেয়েরা কওমি মাদরাসার সোনালী আঙিনায় এসে লেখাপড়া করছে। এর অসংখ্য নজির আছে।
ইলিয়াস মশহুদ: সদ্যপ্রাপ্ত কওমি স্বীকৃতির আগে মাদারিসে কওমিয়ার যে একটা আলাদা ভাব-মর্যাদা ছিলো, সাম্প্রতিক বাস্তবতায় সেটা আগের মতো নেই বলে অনেকে মনে করেন, আপনি কীভাবে ব্যখ্যা করবেন?
গাছবাড়ী হুজুর: আপনার প্রশ্ন ঠিক হয়নি। স্বীকৃতির প্রশ্নে ভাব-মর্যাদালুপের কী সম্পর্ক? আমার কাছে তো মনে হয়, সমাজে আগের চেয়ে কওমি মাদরাসার মান-মর্যাদা আরও বেড়েছে। এটা তো পরিষ্কার যে, সেটা তারা স্বীকৃতির মাধ্যমে স্বীকারও করেছেন।
ইলিয়াস মশহুদ: খলিফায়ে মাদানী হযরত বদরুল আলম শায়খে রেঙ্গা রাহ.’র স্মৃতিবিজড়িত সিলেটের অন্যতম একটি দ্বীনি বিদ্যাপীঠ জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গার শতবছর পূর্তি ও দস্তাবন্দী মহাসম্মেলন কওমি অঙ্গনের জন্য কতটুকু গর্বের?
গাছবাড়ী হুজুর: এটা একটা মাইলফলক। একটা প্রতিষ্ঠানের জন্য দীর্ঘ একশত বছর পার করা চট্টিখানি কথা নয়। একশো বছর ধরে দ্বীনের পেছনে মেহনত করেছে, এমন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে হাতেগোনা কয়েকটি মাত্র। এর মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে জামেয়া রেঙ্গা।
হযরত শায়খে রেঙ্গা রাহ.’র মুহতারাম পিতা মাওলানা আরকান আলী রাহ.’র ও শায়খ সাহেব রাহ.’র খুলুসিয়্যতের ও অক্লান্ত মেহনতের ফসল এই জামেয়া। দ্বীনি অঙ্গনে জামেয়ার শতবছর পূর্তি একটি বিশাল সফলতা হিসেবে সমাজ ও রাষ্ট্র গ্রহণ করে নিতে বাধ্য।
ইলিয়াস মশহুদ: রাজনীতি ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের আকাবির ও আসলাফের প্রায় সবাই রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন; কিন্তু হাল আমলে বাংলাদেশের অধিকাংশ আলেম রাজনীতি থেকে অনেকটা দূরে সরে আছেন। এব্যাপারে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী?
গাছবাড়ী হুজুর: রাজনীতি ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ, কথা ঠিক। আমাদের আকাবির ও আসলাফের প্রায় সবাই রাজনীতি করেছেন, এটাও সত্য। কিন্তু সবাইকে যে সক্রিয়ভাবে মাঠে-ময়দানে নেমে কাজ করতে হবে, বিষয়টা তেমন নয়। তেমনিভাবে কওমি মাদরাসায় পড়ে সবাইকে তালিম-তাআল্লুমে মশগুল হয়ে যাওয়াটাও জরুরি নয়; বরং ইলমে ওহীর জ্ঞানার্জন করে আমাদেরকে দ্বীন ও সমাজের সব সেক্টরে কাজ করতে হবে। এখন যদি সবাইকে রাজনীতি করতে হয়, তবে মসজিদ-মাদরাসা, খানকা, ওয়াজ-মাহফিল; এগুলো কে করবে? বরং উচিত হলো, রাজনীতি জ্ঞান রাখেন এমন কিছু সংখ্যক লোককে আমাদের ব্যবস্থাপনায় সক্রিয় রাজনীতি করতে দেয়া। তাদেরকে গড়ে তুলা। তারা কাজ করুক আমাদের প্রতিনিধি হয়ে। আর আমরা দারস-তাদরিসে তাদের হয়ে কাজ করি। কিন্তু একসাথে সবকিছু করা সম্ভব নয়। এর দ্বারা ফলাফল ভালো হয় না। সব কথার পরে, আমরা ইসলামি রাজনীতিকে সমর্থন করি। দিল থেকে বিশ্বাস রাখি। তাদের সহযোগিতা করি প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে।
ইলিয়াস মশহুদ: আকাবিরদের রাজনীতি আর বর্তমান রাজনীতির মাঝে কোনো তফাত পরিলক্ষিত হয়?
গাছবাড়ী হুজুর: বিস্তর তফাত আছে। আমাদেও আকাবির-আসলাফের রাজনীতি ছিল আল্লাহর জমীনে খেলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করা। তাঁরা মেহনত করেছেন লিওয়াজহিল্লাহ, সফলও হয়েছেন অনেক ক্ষেত্রে। রিয়া বা আত্মকেন্দ্রিক রাজনীতি তাঁরা করতেন না। বর্তমানের রাজনীতিতে যা কিছুটা হলেও বিদ্যমান।
ইলিয়াস মশহুদ: কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ সনদকে সাধারণ শিক্ষার স্নাতকোত্তর ডিগ্রির স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, এটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
গাছবাড়ী হুজুর: আসলে আমরা যেটা চেয়েছি, সরকার সেটাই দিয়েছে। সাধারণ শিক্ষায় ‘স্নাতকোত্তর ডিগ্রি’র মান একটা কাঙ্ক্ষিত প্রাপ্তি। স্বকীয়তা বজায় রেখে নিজেদের ব্যবস্থাপনায় মক্তব থেকে ফযিলত পর্যন্ত পরীক্ষা পদ্ধতি অবলম্বনের পর শুধু দাওরা হাদিসকে ‘স্নাতকোত্তর ডিগ্রি’র পাওয়া অনেক কিছু।
ইলিয়াস মশহুদ: সরকার স্বীকৃত আল হাইআতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশের অন্যতম এক সদস্য আপনি, তো আগামিতে কওমি মাদরাসার পরীক্ষাব্যবস্থা বা পাঠ্যসূচিতে কোনো পরিবর্তন আনা হবে কি?
গাছবাড়ী হুজুর: স্বীকৃতি গ্রহণের প্রশ্নে তো কওমি মাদরাসার পরীক্ষাব্যবস্থা বা পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন বিষয়ক কিছু লেখা নেই। তার ওপর আমরা স্বীকৃতি গ্রহণই করেছি উসূলে হাশতেগানার ভিত্তিতে। কওমি মাদরাসার সিলেবাস ও পরীক্ষাপদ্ধতি কওমি সংশ্লিষ্টরাই দেখভাল করবেন, সরকার এতে হস্তক্ষেপের সুযোগ দেয়া হবে কেন? আর এটা তো আমাদের ঐতিহ্যের খেলাফ।
ইলিয়াস মশহুদ: কওমি স্বীকৃতির ফলে ছাত্র-ছাত্রীরা সরকারি কী কী সুবিধা পাবে বা উচ্চশিক্ষা গ্রহণে এই সনদ কতোটা কাজে আসবে বলে মনে করেন?
গাছবাড়ী হুজুর: স্বীকৃতি অর্জনের মানে তো েই নয় যে, আমরা সরকারের চাকুরী করবো। আমরা স্বীকৃতির মাধ্যমে মূলত আমাদের শিক্ষার স্বীকৃতি পেয়েছি রাষ্ট্রীয়ভাবে। যদিও এই স্বীকৃতি আমাদের দরকার ছিল না। কারণ, আমরা তো আল্লাহর পক্ষ থেকে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। কিন্তু দুনিয়াবী নেজাম অনুযায়ি এমন একটা স্বীকৃতি আমাদের প্রয়োজন ছিলো, তাই আমরা নিয়েছি। এর সাথে সরকারী চাকুরীর কোনো সম্পর্ক নেই। তবে কেউ যদি সরকারী চাকুরীর সুযোগ নিতে চায়, নিতে পারে। সেটা ব্যক্তির ব্যাপার।
ইলিয়াস মশহুদ: কওমি মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের মেজাজ হচ্ছে, মাদরাসায় পড়ে বা আলিম হয়ে কেউ যদি মসজিদ-মাদরাসায় খেদমত না করে, তবে তাকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় যে, সে লেখাপড়ায় ভালো ছিল না বা তার ইলম মাকবুল হয়নি, বিষয়টা আপনি কীভাবে দেখবেন?
গাছবাড়ী হুজুর: এমন ধারণা বা ভাবনার আসলে কোনো যৌক্তিকথা নেই। শুধু মসজিদ-মাদরাসার খেদমতকে ‘দ্বীনের খেদমত’ মনে করা অন্যায়। হ্যাঁ, মসজিদ-মাদরাসার খেদমতের শান মান বেশি। তাই বলে সবাইকে যে তালীম-তায়াল্লুমে মশগুল হতে হবে এমন নয়; বরং সমাজের সব ডিপার্টমেন্টে আমাদের বিচরণ থাকা চাই। তবে হঁ্যা, দ্বীনের খেমদমতের নিয়তে।
ইলিয়াস মশহুদ: অনেকে দাবি তুলছেন, কওমি মাদরাসায় শিক্ষকদের বেতন সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা করা হোক, এই দাবির সাথে আপনি কি একমত?
গাছবাড়ী হুজুর: দেখুন! ১০ হাজার কেন ১০ লক্ষ হলেও তো আমার কোনো ক্ষতি নেই। বরং আমি খুশি হব। যারা দাবী তুলছেন, তারাও তো কওমি মাদরাসার সার্বিক হালত সম্পর্কে ওয়াকিফহাল। সুতরাং কতৃর্পক্ষ সর্বোচ্চ সম্মানীর ব্যবস্থা করবে। নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ি। আর এটাই ইনসাফের কথা।
ইলিয়াস মশহুদ: আমরা জানি আপনি এবং রেঙ্গার মরহুম মুহাদ্দিস সাহেব হুজুর একসাথে হাটহাজারী মাদরাসায় লেখাপড়া করেছেন। তাছাড়া এদারায় আপনারা একসাথে কাজ করেছেন। লেখাপড়া শেষে হযরত মুহাদ্দিস সাহেব রাহ. আজীবন জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গা সিলেটের দারসে হাদীসের মসনদে সমাসীন ছিলেন। গত ২৬ শে রমজান সিলেটবাসীকে এতীম করে মাওলার সান্নিধ্যে চলে যান। তো হযরত রাহ. এর কর্মবহুল জীবন সম্পর্কে আপনার অনুভূতি কী?
গাছবাড়ী হুজুর: মরহুম হযরত শিহাবুদ্দিন রাহিমাহুল্লাহ নববী আখলাকের অনন্য এক বুযুর্গ ছিলেন। তাঁর সাথে আমার অনেক স্মৃতি। তিনি আমার সহপাঠী, সহকর্মী এবং আত্মীয়ও। আল্লাহপাক তাঁকে জান্নাতের আ’লা মাকাম দান করুক।
ইলিয়াস মশহুদ: আযাদ দ্বীনি এদারায়ে তালীম বাংলাদেশ (কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড) দেশের সর্বপ্রাচীন দ্বীনি শিক্ষা বোর্ড। এর প্রতিষ্ঠায় হযরত শায়খে রেঙ্গা রাহ. এবং জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গার কী ভূমিকা রয়েছে তা হযরতের কাছ থেকে জানতে চাই।
গাছবাড়ী হুজুর: এদারা প্রতিষ্ঠার শুরুলগ্ন থেকে যে কজন বুযুর্গ অবিশ্রান্ত মেহনত করেছেন, হযরত শায়খে রেঙ্গা রাহ. তাদের অন্যতম একজন। রেঙ্গা মাদরাসাও এদারা প্রতিষ্ঠাকালীন ১১টি মাদরাসার একটি। এছাড়া এদারার সূচনালগ্নে রেঙ্গা এলাকায় এর অফিসিয়ালী অনেক কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়েছে। পাশাপাশি পরীক্ষার্থী এবং ফলাফলের কারণে রেঙ্গা মাদরাসার মাধ্যমে এদারারও সুনাম হচ্ছে।
ইলিয়াস মশহুদ: প্রচলিত দস্তারবন্দী সম্মেলন সম্পর্কে আপনার মতামত কী? এ ব্যাপারে শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গী কী?
গাছবাড়ী হুজুর: দস্তারে ফযীলত প্রদান আমাদের আকাবির ও আসলাফের রীতি। যা বর্তমানে মাদারিসে কওমিয়ার শিআর হিসেবে প্রসিদ্ধ হয়েছে। এর দ্বারা সমাজ-রাষ্ট্রে কওমি মাদরাসার শক্ত অবস্থানটা তুলে ধরা যায়। আমাদের আকাবির ও আসলাফ এরকম দস্তারবন্দী করেছেন। আলেম-হাফেজদের সম্মানীত করেছেন। তবে এসব সম্মেলন করতে গিয়ে যেন বাড়াবাড়ির দিকে আমরা ধাবিত না হই।
ইলিয়াস মশহুদ: বর্তমানে বছরের সিংহভাগ সময় প্রচলিত ওয়াজ মাহফিল চলতে থাকে। গ্রাম-গঞ্জে, শহর-বন্দরে, পথে-ঘাটে ও হাটে-মাঠে সর্বত্রই ওয়াজ মাহফিলের আয়েজন করা হয়। এসব মাহফিলে ওয়াজের চেয়ে আওয়াজের প্রাধান্য দেয়া হয়ে থাকে। এব্যাপার আপনার কিছু বলার আছে কি?
গাছবাড়ী হুজুর: রাজনৈতিক সভা-সেমনিার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বাণিজ্যিক প্রচারণা এবং ধর্মীয় ওয়াজ-মাহফিলের আলোচনার সাউন্ড মূল অনুষ্ঠানস্থলে সীমাবদ্ধ রাখাই যৌক্তিক। অনুষ্ঠানস্থলের বাহিরে মাইক লাগিয়ে অন্যদের শুনতে বাধ্য করা অন্যায় এবং অযৌক্তিক।
ওয়াজ মাহফিলে প্যান্ডেলের বাহিরের মাইক বড়জোর রাত ১০টা পর্যন্ত চালু থাকতে পারে। এরপর শুধু প্যান্ডেলের ভেতরের সাউন্ডবক্স ব্যবহার করা উচিত।
কারণ, গভীর রাত পর্যন্ত বাহিরের মাইক ব্যবহারের কারণে অন্য ধর্মের অনুসারী কিংবা ঘুমন্ত মানুষ, শিশু, অসুস্থ লোক এবং বিশেষ করে শিক্ষার্থী; এমনকি মাহফিলের আশপাশের মানুষদের জরুরি প্রয়োজনে মোবাইলে কথাবার্তা বলাও দুরূহ হয়ে যায়। কারো ক্ষতি করে, কাউকে কষ্ট দিয়ে এভাবে ইসলাম প্রচার কোনো ভাবেই ইসলামে অনুমোদিত নয়।
ইলিয়াস মশহুদ: সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
গাছবাড়ী হুজুর: আপনাকেও।