সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) আসনের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত জটিল এবং বহুমুখী। এই আসনে এবারের নির্বাচনী লড়াই ব্যালট বক্সে আর সীমাবদ্ধ নয়। মূল ফোকাসে চলে এসেছে আকিদা, রাজনৈতিক কৌশল এবং ব্যক্তিগত প্রভাব। একদিকে দুটি জোটের লড়াই, অন্যদিকে ধর্মীয় জামায়াত, জমিয়ত ও খেলাফতের পারস্পরিক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এই আসনকে টক-অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত করেছে।
এই আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন খেলাফত মজলিস ও ১০ দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী মুফতি আবুল হাসান। আবার বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মামুনুর রশীদ (চাকসু মামুন) এখনো মাঠে থাকায় ভোট ব্যাংকে ফাটল ধরেছে বলেই মনে হয়। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মাঝে বিভক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তা ছাড়া এই আসনের রাজনীতিতে ‘আকিদা’ বা ধর্মীয় বিশ্বাস সবসময়ই বড় ফ্যাক্টর। জমিয়ত নেতাকর্মীরা ঐতিহাসিকভাবে নিজেদের দেওবন্দি আদর্শের কঠোর অনুসারী হিসেবে দাবি করেন। অথচ রাজনৈতিক প্রয়োজনে তাদের কর্মকাণ্ডে মাঝেমধ্যেই বৈচিত্র্য দেখা যায়। যেমন :
জামায়াত-জমিয়ত সম্পর্ক। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ‘জামায়াত-জমিয়ত ভাই ভাই’ স্লোগান উঠেছিল রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে খেলাফত মজলিসের প্রার্থীকে ‘মওদুদিবাদ বা জামায়াতের দোসর’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে জমিয়ত কর্মীরা ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগাতে চাইছেন। এই স্ববিরোধী অবস্থান সাধারণ ভোটারদের মনে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
আকিদাগতভাবে চরম বিরোধ থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক স্বার্থে ফুলতলী দরবারে যাওয়া বা তাদের সাথে সমঝোতার চেষ্টা জমিয়ত ও খেলাফত উভয় দলের প্রার্থীর ভোটারদের কাছে ‘সুবিধাবাদী রাজনীতি’ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
২০২৪ সালের আমি-ডামি নির্বাচনে আঞ্জুমানে আল ইসলাহর সভাপতি মাওলানা হুছামুদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী কেটলি প্রতীকে লোকদেখানো সমঝোতামূলক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হয়েছিলেন।
লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, কট্টর জামায়াত-বিরোধী হিসেবে পরিচিত মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের আপন ভাইকেও সেই নির্বাচনে হুছামুদ্দিন চৌধুরীর পক্ষে নির্বাচনী সভায় প্রকাশ্যে সমর্থন ও সহানুভূতি প্রকাশ করতে দেখা গেছে।
পারিবারিক এই দ্বিধাভক্তি এবং ভিন্ন আদর্শের প্রার্থীর প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের শক্ত অবস্থানকে কিছুটা হলেও নৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
এই আসনের মূল তিন প্রার্থী তথা মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক সাহেবের পক্ষে জোটের সমর্থন রয়েছে। এ ছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত ক্লিন ইমেজ, জমিয়তে উলামার সমর্থন এবং ‘ধর্মপ্রাণ’ নারী ভোটাররাও তাঁকে পছন্দ করবেন বলে ধরে নেওয়া যায়। তবে তাঁর পারিবারিক পরিমণ্ডলে রাজনৈতিক ভিন্নমত লালনকারীর সংখ্যাও কম নয়। ফলে এটা নিয়ে তিনি বিপাকে পড়তে পারেন বলে ধারণা।
অপরদিকে সজ্জন ও সরলভাষী খেলাফত মজলিস ও ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী মাওলানা মুফতি আবুল হাসান সাহেবের রয়েছে ১০ দলীয় সমর্থন। পুরো জকিগঞ্জ উপজেলা থেকে এই আসনের একমাত্র প্রার্থী তিনি। ফলে এলাকার সমর্থনের পাশাপাশি দলমত নির্বিশেষে বিশাল অংশের ভোট তিনি পেতে পারেন। তবে তাঁর ব্যাপারে বিরোধীপক্ষের অপপ্রচারও রয়েছে। জামায়াত সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ দিয়ে তাঁকে কোনঠাসা করার চেষ্টাও হবে। এসব চেলেঞ্জ মুকাবিলা করে তাঁকে এগিয়ে যেতে হবে।
তৃতীয় আলোচিত প্রার্থী হলেন মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক সাহেবের আত্মীয় বিএনপ্রির বিদ্রোহী প্রার্থী মামুনুর রশীদ (চাকসু মামুন)। তিনি বিএনপির তৃণমূলের একটি অংশের সমর্থন পাবেন বলে মনে হচ্ছে। যদি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকেন।
মোটকথা, সিলেট-৫ আসনের লড়াই এখন ব্যালেট বক্সের পাশাপাশি আকিদাগত বিষয়ে রূপ নিয়েছে। এখানে রাজনৈতিক কৌশলের পরিবর্তে পরচর্চা হচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত জকিগঞ্জ-কানাইঘাটের সচেতন ভোটাররা কি আদর্শিক সংঘাতকে প্রাধান্য দেবেন, নাকি রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ব্যক্তি ইমেজকে ভোট দেবেন—সেটাই দেখার বিষয়।
তবে যা-ই হোক, দিন শেষে এই আসনে একজন আলেম প্রার্থী বিজয়ী হবেন, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়।
লেখক: সম্পাদক ও সাংবাদিক, সিলেট।